ভেনেজুয়েলার তেল ঘিরে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সমঝোতার ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভারত ভবিষ্যতে ইরান নয়, ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন ওয়াশিংটন আগের দিনই নয়াদিল্লিকে জানায়—রুশ তেলের বিকল্প হিসেবে শিগগিরই ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা পুনরায় শুরু করতে পারে।
ফ্লোরিডাগামী বিশেষ বিমান এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে একটি বাণিজ্যচুক্তির ‘ধারণাগত কাঠামোতে’ পৌঁছেছে। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির বিষয়টি ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার কারণে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের মার্চে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে রুশ তেল আমদানির প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় ভারতের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল খাত দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবাধীন রাখার কৌশলও অনুসরণ করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো, ভারতের মাধ্যমে রাশিয়ার তেল রপ্তানি আয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনা। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার তেল সরাসরি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর মাধ্যমে নাকি আন্তর্জাতিক ট্রেডিং হাউস—যেমন ভিটল বা ট্রাফিগুরার মাধ্যমে ভারতে যাবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
এই প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ কোনো মন্তব্য করেনি। একইভাবে ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রুশ তেলের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জারি হলে ভারত স্বল্পমূল্যের রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের কারণে সেই আমদানি কমছে।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জানুয়ারিতে যেখানে ভারত দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করছিল, সেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা কমে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। মার্চে এই পরিমাণ আরও কমে দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ব্যারেলে নামতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তা দৈনিক ৫–৬ লাখ ব্যারেলে সীমিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রুশ তেল আমদানি কমে যাওয়ায় ভারত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে তেল সংগ্রহ বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি ও এইচপিসিএল–মিত্তাল ইতিমধ্যে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করেছে।
তবে ব্যতিক্রম হিসেবে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ফেব্রুয়ারি থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ দেড় লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে ভারত। দুই দেশের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা। কৃষি, ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও ওষুধ খাতে বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ দেখছে নয়াদিল্লি।
অন্যদিকে রাশিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা ও ভারতীয় জনবল নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করাই ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্র ও জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে