80°F শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতার পথে

বস্টন বাংলা, Boston Bangla

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ৯
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতার পথে

বর্তমান সরকার ক্ষমতার চার মাসের মাথায় প্রথম বিদেশ সফর করেন মালয়েশিয়া ও চীন| চীন থেকে ফিরে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে ব্যক্ত করেন যে, যে কোন মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে|
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় ঘোষণা—“তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবেই, ইনশাআল্লাহ”—উত্তরাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে| তিস্তা নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে সংকট, সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক আলোচনা চলে আসছে, এই ঘোষণার পর তা নতুন মাত্রা পেয়েছে| তবে বাস্তবতা হলো, জনগণ এখন আর কেবল আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়| কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত|

বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তা| এর ওপর নির্ভরশীল লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার লাখো মানুষ| বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির কারণে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়| আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যে কৃষিকাজ, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়| চরাঞ্চলের মানুষ চরম অভাব অনটনে দিন যাপন করে|

তিস্তা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ নয়| এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি সমম্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে| পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হতে পারে|

তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে| প্রথমত, আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে তিস্তার পানিবণ্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু| শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়| তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করতে কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, পানির হিস্যা আদায় করতে হবে| 
দ্বিতীয়ত, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ¯^চ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি| অতীতে দেশের বড় বড় প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে| তিস্তা মহাপরিকল্পনার ক্ষেত্রেও যেন সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে| প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন| জনগণের করের অর্থে পরিচালিত এমন একটি প্রকল্পে ¯^চ্ছতা শুধু ˆনতিক দায়িত্ব নয়, উন্নয়নের পূর্বশর্ত|

তৃতীয়ত, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| নদীকে কেবল প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে| প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যেন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ চলমান থাকে| জীববৈচিত্র্যে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়| সে বিষয়ে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে| উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই হবে টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি|

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য| নদীতীরবর্তী মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও মতামতকে গুরুত্ব না দিলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে| পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় জনগণ, বিশেষজ্ঞ, কৃষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হলে প্রকল্পটি আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে|

তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ| রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ পরিকল্পনা স্বচ্ছতা বাস্তবায়ন এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ˆবপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে| সংসদে উচ্চারিত অঙ্গীকারের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রমাণিত হবে, যখন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মানুষের চোখে পড়বে এবং তিস্তা তীরবর্তী মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে|
বাস্তব উন্নয়নই এখন সময়ের দাবি| তিস্তা মহাপরিকল্পনা সেই দাবির একটি বড় পরীক্ষা| দেশের মানুষ আশা করবে, এই অঙ্গীকার আর অতীতের মতো আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে|