আজাদ খান
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর অভিঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একজন তরুণ ছাত্রনেতা থেকে সদ্য উদীয়মান রাজনৈতিক কণ্ঠ—হাদীর এই আকস্মিক প্রস্থান কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি জাতির অমীমাংসিত ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্নকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় দিনের আলোতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ছয় দিন পর তার মৃত্যু দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার বিস্ফোরণ ঘটায়। ৩২ বছর বয়সে হাদী ছিলেন ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং আসন্ন নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী। তার হত্যাকাণ্ড তাই কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে সংঘটিত একটি ভূমিকম্পসদৃশ ঘটনা।
গঠনপর্ব: গ্রাম থেকে আন্দোলনের কেন্দ্রে
শরীফ ওসমান হাদীর জন্ম ১৯৯৪ সালে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার একটি গ্রামীণ পরিবারে। বাবা ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক অনুশাসনের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক মাদ্রাসা শিক্ষার পর তিনি ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করেন—যে ক্যাম্পাস বহু দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক পরিবেশেই হাদীর সক্রিয়তা স্পষ্ট রূপ নেয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি জাতীয়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন হাদীকে কেবল একজন বক্তা নয়, বরং একটি প্রজন্মের হতাশা ও প্রত্যাশার প্রতিনিধি করে তোলে।
রাজনৈতিক দর্শন: ইনসাফ, সার্বভৌমত্ব ও বিপ্লব
হাদীর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল “ইনসাফ”—ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও মানবিক মর্যাদার ধারণা। তার কাছে রাজনীতি ছিল কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি ছিল একটি নৈতিক সংগ্রাম।
হত্যাকাণ্ড ও উত্তাল প্রতিক্রিয়া
১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চলার সময় মোটরসাইকেল আরোহীরা হাদীর মাথায় গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
উত্তরাধিকার ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু তাকে এক আন্দোলনের শহীদে রূপান্তরিত করেছে। তার উত্তরাধিকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলবে।
লেখক আজাদ খান, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সরকার।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে