ঐক্যের রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দর্শন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৮১ সাল ছিল এক গভীর সংকটের সময়। সেই বছর জাতি হারায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামীহারা বেগম খালেদা জিয়া তখনো একজন গৃহবধূ হিসেবেই পরিচিত। রাজনীতির ময়দানে তার সক্রিয় ভূমিকা তখন কারও কল্পনাতেও ছিল না।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত হন বিচারপতি সাত্তার, আর বিএনপি পড়ে যায় দিশাহীন এক অনিশ্চয়তায়।
দলের ভবিষ্যৎ, নেতৃত্ব এবং আদর্শ—সবকিছু নিয়েই তখন প্রশ্নের মুখে বিএনপি। প্রবীণ বয়স ও দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে দলের ভেতর আস্থার সংকট তৈরি হয়। কোন্দল আর বিভক্তির সেই সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার।
অসংখ্য প্রতিকূলতা, নির্যাতন ও চাপের মুখেও তিনি দেশ ছাড়েননি। বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারে রাজপথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে বিএনপিসহ একাধিক দল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়। সেই সময় থেকেই দলটির ওপর শুরু হয় নজিরবিহীন রাজনৈতিক চাপ। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির মামলা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা, গুম ও হত্যার ঘটনা বিএনপিকে গভীর সংকটে ফেলে। তবুও তার নেতৃত্বে দল ভাঙেনি—ঐক্য অটুট ছিল।
এই কঠিন সময়ের মধ্যেই ২০১৫ সালে ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে আরেকটি গভীর শোক। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারান তিনি। রাজনীতি থেকে সরে গেলে হয়তো এই ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত, কিন্তু দেশ ও দলের প্রয়োজনে তিনি কখনোই নিজের দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা পরে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। আরও একটি মামলায় সাজা দেওয়া হয় তাকে। দীর্ঘ কারাবাসে তার শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে অবনতির দিকে যায়। করোনাকালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তি পেলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই সময় থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে যান। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। কিন্তু প্রতিকূলতার পাহাড় সত্ত্বেও বিএনপির ভেতরে ঐক্যের ভিত্তি অটুট থাকে—যার মূল শক্তি ছিল খালেদা জিয়ার আদর্শ।
স্বামী হত্যার পর সন্তান হারানো, অসংখ্য মামলার বোঝা, দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন—সবকিছুর মাঝেও তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেননি। বরং দেশজুড়ে শান্তি, সহনশীলতা ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন বারবার।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে বেগম খালেদা জিয়াকে সব মামলা ও দণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগের দিন, ৫ আগস্ট, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি নিজের কেবিন থেকে জাতির উদ্দেশে ভিডিও বার্তা দিয়ে দেশরক্ষার আহ্বান জানান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি রেখে গেছেন এক গভীর মানবিক বার্তা—
“ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলুন।”
এই ছিল বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি—ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, সহিংসতার বিপরীতে শান্তি এবং বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের দর্শন। তার জীবন ও আদর্শ আজও প্রমাণ করে, একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে