54°F বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

নির্বাচন সামনে রেখে ধীর হচ্ছে অর্থনীতির গতি: বিনিয়োগ ভাটা, মূল্যস্ফীতি ও আস্থাহীনতায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা

Online Desk, Boston Bangla

প্রকাশ: ২৮ নভে ২০২৫ | নিউজটি দেখেছেন: ৪১
নির্বাচন সামনে রেখে ধীর হচ্ছে অর্থনীতির গতি: বিনিয়োগ ভাটা, মূল্যস্ফীতি ও আস্থাহীনতায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুস্তরীয় চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক লেনদেনে মন্থর গতি, বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী ভাটা এবং ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ—এই সব মিলেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চোখে পড়ার মতো ধীরগতি নেমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আরও বেশি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে দ্রুত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব এখনও দৃশ্যমান নয়। দেড় বছর পার হয়ে আসতেই যখন জাতীয় নির্বাচন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন—আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতি আরও অস্থির হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। বরং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গ্রাম-পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের প্রবণতায় তেমন পরিবর্তন দেখা যাবে না। ফলে কর্মসংস্থানের স্থবিরতা থেকেও ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা—টাকার প্রবাহ বাড়লেও তা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

এ সময় নির্বাচনী ব্যস্ততায় বাজেট বাস্তবায়নের গতি আরও মন্থর হয়ে পড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই উন্নয়ন খরচ আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। প্রথম তিন মাসেই (জুলাই–সেপ্টেম্বর) সরকারের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য চাপ তৈরি করছে।

এনবিআরের হিসাব বলছে—চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নির্বাচন ঘিরে ভোগব্যয় বাড়বে, বাজারে নগদ প্রবাহ বাড়বে—এতে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “দারিদ্র্য বাড়ছে, আয়ের উৎস কমছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে সেটা সম্ভব নয়।” তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ না বাড়ালে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুটিই স্থবির থাকবে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চাপে রেখেছে। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.১৭% হলেও বাজেটের লক্ষ্য থেকে তা অনেক বেশি। আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বাড়ার কারণে দারিদ্র্যসীমায় ফিরতে থাকা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাসে জানিয়েছে—পরবর্তী কয়েক বছরে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৬ কোটির ওপর যেতে পারে, যদি কর্মসংস্থানের চাকা সচল না হয়।

এদিকে বিনিয়োগ পরিবেশেও নেমে এসেছে তীব্র অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় উদ্যোক্তারা বড় সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতেও আস্থাহীনতা বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১১%। অর্থাৎ নতুন কারখানার প্রবৃদ্ধি নেই বরং বহু পুরোনো শিল্পকারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো আবার চালু হওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও নেই।

সর্বোপরি, অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন—অর্থনীতির চাকা আবার গতিশীল করতে হলে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।