হাদীর হামলায় রাজনৈতিক বেড়াজাল
হাদীর ওপর হামলা, এবং হামলাকারীর নিরাপদে এক্সিট হয়ে ভারতে যাওয়া—সেখানে গিয়ে ছবি তোলা, নিজেকে নিরাপদ বোধ করা—সবকিছুই যেন নিখুঁতভাবে পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—কীভাবে করল? কারা করাল? কারা সাহায্য করল? কীভাবে ভারতে গেল? আর যাওয়ার আগে “হামলাকারীকে ধরলে ৫০ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে”—এই নাটক সাজিয়ে প্রশাসন যদি জনগণকে বোঝাতে চায় যে তারা নিষ্পাপ, মাসুম বাচ্চা—তাহলে সেটি আরও বড় সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি করে।
হাদীর হামলার পর এখন সব রাজনৈতিক দল ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে—যেন একটি ফুটবল; সবাই লাথি মারছে, বারপোস্টে গোল দেওয়ার দিকে ছুটছে। ন্যায়বিচারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে কার লাভ, কার ক্ষতি—এই হিসাবটাই যেন বড় হয়ে উঠছে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উসমান হাদী যতটা সোচ্চার ছিলেন, তার চেয়েও বেশি সোচ্চার ছিলেন উপদেষ্টা মণ্ডলীর অপরাধের প্রতিবাদে। এমনকি বিএনপির চাঁদাবাজি ও দেশ নিয়ে তিনি টকশোতে কথা বলেছেন; সেখানে সেনাবাহিনীকে পর্যন্ত ছাড় দেননি। তিনি ছিলেন তরুণ, সৎ, এবং ঈমানি শক্তিতে একা থেকেও সাহসিকতার সঙ্গে হিম্মত পোষণকারী একজন কণ্ঠ। আর ঠিক এই “নিষ্পাপ মানসিকতা”কে সুযোগ হিসেবে নিয়ে সাজানো হলো এই নৃশংস হামলার ছক—এমন সন্দেহ এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কোনো পদধারীকে জেল থেকে মুক্ত করে তাকে দিয়ে যদি হামলা করানো হয়, তাহলে সবাই আওয়ামী লীগকে দোষ দেবে—সে হিসেবে ব্যক্তি নির্বাচনও ‘ঠিক’ করা হয়েছিল—এমন ধারণাও অনেকে তুলছেন। আবার, যেহেতু হাদী ভারতবিরোধী ছিলেন, তাই ভারতে যাওয়া ‘সহজ’—তাহলে ভারতে যাওয়ার সুযোগ করে দিল কারা? কে চেয়েছিল হাদীকে সরাতে, যাতে রাজনৈতিক মাঠ আরও “জমে” ওঠে—এ কারণেই এই হামলার নাটকীয়তা বাস্তব রূপ পায় বলে অনেকের সন্দেহ। এখন বিএনপির জন্য এটাকে কেউ কেউ ‘সুবর্ণ সুযোগ’ বলছে—কারণ হাদীর মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ সহজে আর উঠবে না।
জামাত এই আবেগকে ব্যবহার করবে—এই “আল্লাহওয়ালা” মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের মন আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবে, এবং সেখানে তারা কিছুটা সফলও হয়েছে—এমন বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে ইসলামিক দলগুলোর একটি অংশ গজল আর দোয়ায় মশগুল—ফলে মাঠে যে শেয়াল-ধান-পাখির খেলা চলছে, তার কোনো ঠাওর নেই।
এভাবেই হাদীরা হারিয়ে যায়, আর তার স্মৃতি নিয়ে খেলতে থাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বীদরা। এই হামলার পর যে “ফায়দার রাজনীতি” শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে—ন্যায়বিচারের চেয়ে অনেকের কাছে লাভ-লোকসান বড়। তাই হাদীকে “হাদী-শূন্য” করতে সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি ইসলামিক দলগুলোও; কারণ এই নীরবতা, সুবিধাবাদ, এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত সত্য কথা বলা কণ্ঠকে একা করে দেয়।
হাদীর জন্য বিচার চাই মানে শুধু একজন মানুষের জন্য নয়—মতপ্রকাশ, প্রতিবাদ, এবং ন্যায়ের জায়গা বাঁচানোর জন্য বিচার চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই “বিচার চাওয়াটাও” এক ধরনের রাজনীতির খেলায় পরিণত হচ্ছে; আবেগকে পুঁজি করে মানুষকে দাঁড় করানো হচ্ছে, আবার প্রয়োজন ফুরালে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই আবেগের রাজনীতিতে আমরা কেবল দর্শক ও শ্রোতা—আর খেলোয়াড় হয়ে থাকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল; সঙ্গে থাকে চুপচাপ বসে থাকা কিছু আমলা, যারা সময়মতো নীরব থেকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
~শমসের সরদার
Ed.M.(TTL),Harvard University ,USA
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে