ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্কার ছাড়া নির্বাচন আস্থার সংকটে পড়তে পারে: গবেষণা প্রতিবেদন
দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় অনিয়মের ধরন বদলে গেছে। আগের মতো শুধু ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই নয়, এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও ডেটাভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্বাচন প্রভাবিত করার আশঙ্কা বাড়ছে। অ্যাপ, সফটওয়্যার, ড্যাশবোর্ড এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডার এসব অনিয়মের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান ডিজিটাল কাঠামোর দুর্বলতা সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউট সম্প্রতি প্রকাশিত এক নীতি প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। ‘হাইজ্যাকিং দ্য ভোট: ইনসাইড বাংলাদেশ’স ডেটা-ড্রাইভেন ইলেকশন ম্যানিপুলেশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জাতীয় পরিচয়পত্র, পোস্টাল ভোট, নির্বাচনের ফল ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল সিস্টেমের কাঠামোগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এনআইডি ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ১৮০টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-যার মধ্যে ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর ও বিভিন্ন সেবাদাতা সংস্থা রয়েছে-তথ্য যাচাইয়ের জন্য এনআইডি ডেটাবেজে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। এতে তথ্য ফাঁস ও অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে।
গবেষকদের মতে, এই ডেটাবেজ থেকে যদি প্রবাসী বা মৃত ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তাহলে তাদের নামে জাল ভোট দেওয়া সহজ হতে পারে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি।
প্রবাসী ভোট ব্যবস্থায় আস্থার প্রশ্ন
প্রবাসী ভোটারদের জন্য চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাও প্রতিবেদনে সমালোচনার মুখে পড়েছে। সংস্থাটির মতে, পোস্টাল ভোট কোনো স্বতন্ত্র নিরাপদ ব্যবস্থা নয়; বরং এটি বিদ্যমান দুর্বল ডিজিটাল কাঠামোর অংশ। ফলে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে এই পদ্ধতি চালু করলে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ডিজিটাল ফল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশে ব্যবহৃতব্য ডিজিটাল অ্যাপ ও সফটওয়্যার নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যাপগুলোর নকশা, তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং ডেটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্পষ্ট আইন ও কার্যকর নজরদারি ছাড়া এসব ডিজিটাল টুল ব্যবহৃত হলে প্রাথমিক পর্যায়েই নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ব্যবহারের ঝুঁকি
ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনাকে নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও গবেষণা প্রতিবেদনে এর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে। পুরো সময় ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভিডিও ধারণ করা হলে ভোটাররা নিজেদের ওপর নজরদারি হচ্ছে বলে মনে করতে পারেন, যা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষ করে ক্যামেরা কোথায় বসানো হবে, কতক্ষণ ফুটেজ সংরক্ষণ করা হবে এবং কারা এসব ফুটেজ দেখতে পারবেন-এসব বিষয়ে স্পষ্ট আইন না থাকলে ভোটারের গোপনীয়তা ও আস্থা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফলে তিনটি অস্বাভাবিক ধারা
টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০২৪ সালের ১৫০টি আসনের ফল বিশ্লেষণ করে তিনটি অস্বাভাবিক প্রবণতা শনাক্ত করেছে। কোথাও ভোটার উপস্থিতি কম হলেও বাতিল ভোট অস্বাভাবিক বেশি এবং বৈধ ভোটের প্রায় সবই একজন প্রার্থীর পক্ষে গেছে। আবার কিছু কেন্দ্রে প্রায় শতভাগ ভোট পড়ে একজনের পক্ষে। এ ছাড়া দেশের এক হাজারের বেশি কেন্দ্রে কোনো ভোট বাতিল হয়নি-যা পরিসংখ্যানগতভাবে প্রশ্ন তৈরি করে।
গবেষকদের মতে, এসব অসংগতি তৈরিতে ডিজিটাল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১০ দফা সুপারিশ
ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-এনআইডি ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা, ডিজিটাল ফলাফল ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামূলক পাবলিক অডিট ট্রেল চালু করা এবং সিসিটিভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনগত সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, সময়মতো এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোও আস্থা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার বড় সংকটে পড়তে পারে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে