54°F শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

১৬ ডিসেম্বর ও জাতীয় সত্তার সংকট: আমরা কি স্বাধীনতার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছি?

Online Desk, Boston Bangla

প্রকাশ: ১০ ডিসে ২০২৫ | নিউজটি দেখেছেন: ৩৭
১৬ ডিসেম্বর ও জাতীয় সত্তার সংকট: আমরা কি স্বাধীনতার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছি?

১৬ ডিসেম্বর কি হারিয়ে যাবে, নাকি হারিয়ে যাচ্ছি আমরা?

কথা বলার স্বাধীনতা সবার আছে, তাই সবাই বলতে চায়—নিজের মতো করে। কেউ নিরপেক্ষভাবে বলে, আবার কেউ কেবল নিজের দল আর মতকেই নিষ্পাপ মনে করে বলে। ক্ষমতার নেশায় বিভক্ত, দ্বন্দ্বপ্রিয় এক জনতা প্রতিশোধ নেওয়াকেই সওয়াব আর জান্নাতে যাওয়ার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: আমরা কবে নিরপেক্ষ হবো? কবে আমরা এমন একটি মেধাবী জাতিকে খুঁজে পাবো, যারা নিজেরও সমালোচনা করতে পারে এবং অন্যের মতকেও সম্মান দিতে জানে?

দুই শত বছরের পরাধীনতার শেকল ভেঙে যে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, সেই জাতি আবার চব্বিশ বছরের নিপীড়নের বেড়াজাল ভেঙে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছিল। তাদের সম্মানেই আমরা মাথা উঁচু করে বলি—স্বাধীনতার শুভেচ্ছা।

কিন্তু আজ এই শুভেচ্ছা জানাতেও অনেকেই ভয় পায়। তাহলে কি “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”র কথা বলতে বলতে আমরা প্রথম স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করছি, নাকি ক্ষমতার দাপটে নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছি?

এখন প্রশ্ন উঠেছে, শহীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ, না ৩ লক্ষ—কিন্তু এই বিতর্কের অজুহাতে স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করা চলতে পারে না। যদি সত্যি হয়, স্বাধীনতাকামী সংগঠন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী গত ১৬ বছরে অপরাধ, দুর্নীতি আর নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত থেকেছেন, তবে তাদের অপরাধের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু তাদের অপরাধের কারণে পুরো স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা কোনোভাবেই বাঙালির কাম্য হতে পারে না।

কোনো অত্যাচারী শাসক চিরদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না—এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু মুখস্থ-নির্ভর এই শিক্ষাব্যবস্থায় জাতি যখন কেবল শ্লোগান আর বিরোধিতাতেই অভ্যস্ত, তখন ১৬ বছর ধরে জমা হওয়া আওয়ামী লীগের স্বাধীনতা–রাজনীতির গল্প অনেকের চোখে লোপ পায় তাদের দুর্নীতি আর মজলুম মানুষের ওপর অত্যাচারের ভিড়ে। তবু স্বাধীনতার ধারণা, স্বাধীনতার স্বপ্ন—এগুলো মুছে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।

স্বাধীনতার পুরোনো ইতিহাস পড়ে, শুনে, মুখস্থ করে যে দল নতুন কোনো শাসককে সরিয়ে আবার ক্ষমতায় আসে, তারা চাইলে ৭১-এর ইতিহাস নিয়ে মত, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা দিতে পারে; কিন্তু একে অস্বীকার করতে পারে না। ইতিহাসকে এভাবে দলীয় কূটকৌশলের হাতে তুলে দিলে আজকের তরুণ সমাজও কেবল মুখস্থবিদ্যায় ডুবে থাকবে, প্রশ্ন করতে শিখবে না।

৫ই আগস্ট ক্ষমতা হারিয়ে আওয়ামী লীগ যে শিক্ষা পেয়েছে, সেই শিক্ষা কি ভবিষ্যতের ক্ষমতাসীন দলগুলো পাবে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান—উভয়েই স্বাধীনতার প্রশ্নে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গেছেন, তবু দুই দলই একে অপরের ভূমিকাকে স্বীকার করতে নারাজ। আসলে কে স্বাধীনতার ঘোষক—এই প্রশ্নকে ঘিরে রাজনৈতিক যুদ্ধ আর ‘অফিশিয়াল’ ইতিহাস বারবার আজকের তরুণ প্রজন্মকে ধোঁকা দিচ্ছে। অথচ দু’জনকেই তাদের প্রাপ্য সম্মান ও ঐতিহাসিক ভূমিকায় রেখে নতুন প্রজন্মকে সত্য জানানো সম্ভব।

কিন্তু আমরা কী করছি? আমরা ইতিহাস মুখস্থ করে বিসিএস পরীক্ষায় পাস করার জন্য “সঠিক উত্তর” খুঁজছি, সমালোচনামূলক ভাবনা নয়। এমন শিক্ষা দিয়ে কি আমরা সত্যিই একটি উন্নত দেশ গড়তে পারবো? যখন সবাই সভাপতি হতে চায়, কেউ সহ-সভাপতি হতে চায় না—তখন বোঝা যায়, এই শিক্ষাব্যবস্থা কেবল সনদ আর অহংকার তৈরি করেছে, দায়িত্বশীল নাগরিক নয়।

গত ১৬ বছরে “আওয়ামী স্বাধীনতার রক্ষাকর্তা” আর “জঙ্গিবিরোধী নাটকীয়তা”র নামে অসহায় মানুষকে এমনভাবে টেনে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে অসংখ্য সন্তানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে, মায়ের কোল খালি হয়েছে, পরিবার ভেঙে চুরমার হয়েছে। তাদের শাস্তিই হবে ,বিচার হবে,এটা জনগণের দাবি হতে পারে, হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ৯ মাসের যুদ্ধ আর ১৬ বছরের অন্যায়ের বিচার নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে প্রতিশোধের উন্মাদনায় যদি আমরা আবার সব মিটিয়ে দিতে চাই, তবে নতুন যে দল ক্ষমতায় আসবে, তারাও একইভাবে প্রতিশোধ নেবে। এভাবেই হারিয়ে যাবে মায়ের সন্তান, বোনের স্বামী, আপনজনের ভাই। যে চোখে মায়া নেই, যে চোখে শুধু আগুন—সে চোখ নিজেকেও কখনো শান্তি দিতে পারে না।

আমরা চাই—যে যতটুকু ভাল কাজ করেছে, তার প্রাপ্য সম্মান তাকে দেওয়া হোক; যে যতটুকু অন্যায় করেছে, সে তা স্বীকার করুক, এবং ন্যায়সঙ্গত বিচার হোক। কারণ আমরা যে দলেই করি না কেন, কেউই নিষ্পাপ নয়। আওয়ামী লীগ যে ভুল করেছে, যদি ভবিষ্যতে অন্য দলও সেই একই ভুল করে, তবে আমাদের আবার “তৃতীয় স্বাধীনতা”র অপেক্ষা করতে হবে—এটা কি আমরা সত্যিই চাই?

তাই প্রশ্ন থেকে যায়—

১৬ ডিসেম্বর কি হারিয়ে যাবে?

নাকি আমরা নিজেরাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছি, আমাদের বিবেক, ইতিহাসবোধ আর আত্মসমালোচনার ক্ষমতা।

শমসের সরদার

Ed.M. (TTL), Harvard University

President, Education Justice for Peace Inc.