77°F বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যার প্রধান আসামি এখনো অধরা

বস্টন বাংলা, Boston Bangla

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ১২
র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যার প্রধান আসামি এখনো অধরা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর। এক সময় যা পরিচিত ছিল এক ‘অপ্রবেশযোগ্য স্বতন্ত্র রাজ্য’ হিসেবে। পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি, ভূমি দখল এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্যের এই জনপদ এখন প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে। তবে গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার শাহাদাতবরণের ঘটনাটি পুরো রাষ্ট্রকে নাড়া দিয়েছে। ঘটনার মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সেই রাতের ভয়াবহতা ও র‍্যাব কর্মকর্তার শাহাদাত

গত ১৯ জানুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব-৭-এর একটি দল আলীনগর এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালায়। ওই সময় চিহ্নিত সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনী রামদা, কিরিচ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে র‍্যাব সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলায় ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া গুরুতর আহত হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনায় আরও তিন র‍্যাব সদস্য আহত হন এবং কয়েকজনকে সাময়িকভাবে অপহরণ করা হলেও পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।

অপরাধের স্বর্গরাজ্য ও দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড় জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। নব্বইয়ের দশকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের হাত ধরে এখানে পাহাড় দখল ও প্লট বাণিজ্যের শুরু হয়। আক্কাস নিহত হওয়ার পর এলাকাটি ইয়াসিন মিয়া এবং রোকন মেম্বারের নেতৃত্বে দুটি সশস্ত্র গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা এখানে পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি কায়েম করেছিল। এমনকি সরকারি উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়া ও প্রশাসনের ওপর হামলার একাধিক রেকর্ড রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

যৌথ বাহিনীর ‘চিরুনি অভিযান’ ও বর্তমান পরিস্থিতি

র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যার পর জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের যৌথ অভিযান শুরু হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবিসহ প্রায় ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন। ড্রোনের সহায়তা ও হেলিকপ্টার টহল দিয়ে চালানো এই ‘চিরুনি অভিযানে’ এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, পাইপগান, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম।

বর্তমানে এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে যেখানে প্রায় ৩৬০ জন সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন রয়েছে। র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে মিয়ানমারে ব্যবহৃত গুলির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিচারপ্রার্থী পরিবার ও প্রশাসনের অঙ্গীকার

নিহত র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার পরিবার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে। অন্যদিকে, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় অভিযান অব্যাহত থাকবে। ২০ বছর পর এই এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের দাবি—মূল পরিকল্পনাকারী ইয়াসিন ও রোকন মেম্বারকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে এই জনপদকে চিরতরে নিরাপদ করা হোক।