ইতিহাসের সর্বনিম্নে চীনের জন্মহার, অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ভরসা রোবট ও এআই
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন-এ জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কয়েক দশক ধরে দ্রুত শিল্পায়ন ও বিপুল শ্রমশক্তির ওপর ভর করে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলেও এখন জনসংখ্যার কাঠামোগত পরিবর্তন দেশটির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। কমছে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা, বিপরীতে দ্রুত বাড়ছে পেনশনভোগী প্রবীণ জনগোষ্ঠী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চীন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। যদিও সরকার জন্মহার বাড়াতে নানা প্রণোদনা ও নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে—একসন্তান নীতি বাতিল, দুই ও তিন সন্তানের অনুমতি, নগদ সহায়তা, কর ছাড়—তবুও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি।
জনসংখ্যা কাঠামোর সঙ্গে অর্থনীতির অসামঞ্জস্য
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর জনসংখ্যাবিদ স্টুয়ার্ট গিটেল বাস্টেন সতর্ক করে বলেন, চীন যদি গত ২০–৩০ বছরের উন্নয়ন মডেল একইভাবে চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, জনসংখ্যা কাঠামো ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ক্রমেই বড় অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।
একসময় বিপুল তরুণ শ্রমশক্তি ছিল চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এখন জন্মহার কমে যাওয়ায় নতুন কর্মীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশনব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে ভরসা
এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে চীন জোর দিচ্ছে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদন খাত আধুনিকীকরণ ও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়ে আসছেন। ‘মেড ইন চায়না’ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় উচ্চপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প রোবটের বাজার। আন্তর্জাতিক রোবট ফেডারেশন জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে স্থাপিত মোট শিল্প রোবটের অর্ধেকের বেশি চীনে বসানো হয়েছে। এই উচ্চমাত্রার স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিই দেশটির কারখানাগুলোকে ব্যাপক পরিসরে এবং তুলনামূলক কম দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্যানেল উৎপাদনে সক্ষম করছে। ফলে বিশ্ববাজারে চীনের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং বাণিজ্য উদ্বৃত্তও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মানুষের মতো রোবট তৈরির দৌড়
শিল্প রোবটের পাশাপাশি মানুষের মতো হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে চীন। বর্তমানে ১৪০টির বেশি কোম্পানি এ ধরনের রোবট উন্নয়নে কাজ করছে। কিছু রোবট ইতিমধ্যে উৎপাদন, লজিস্টিক ও গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
নির্মাতাদের দাবি, এসব রোবট এখনো পুরোপুরি মানুষের মতো দক্ষ নয়। তবে পণ্য বাছাই, মান পরীক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার মতো ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রযুক্তি শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর ইস্ট এশিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বার্ট হফম্যান বলেন, জনসংখ্যা হ্রাস যখন অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, তখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে—এমন ধারণা থেকেই চীন এগোচ্ছে।
সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
তবে এই রূপান্তর সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, উৎপাদনশীলতা বাড়লেও স্বল্পমেয়াদে চাকরি কমতে পারে। প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন বদলে যাবে, যা ১৪০ কোটির মানুষের দেশে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক হফম্যানের মতে, যদি শ্রমশক্তি কমার গতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ২০৭০ সালের পর চীন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই চীনের উৎপাদন খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিককে প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতির অধ্যাপক গুওজুন হে বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধানের অংশ হলেও স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সঠিক নীতিমালা ছাড়া তা বেকারত্ব বাড়াতে পারে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি হতে পারে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা শেখাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। যাতে তাঁরা রোবট ও এআই–নির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। পাশাপাশি বেকারত্ব ভাতা, পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ফিলিপ ওকিফ বলেন, জন্মহার কমে যাওয়া সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে, তবে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে—ফলে নীতি সমন্বয়ের জন্য এখনো কিছু সময় আছে।
সামনে কোন পথে চীন?
বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় চীনের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবট হয়তো অর্থনীতিকে কয়েক দশক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন জনসংখ্যা নীতি, শ্রমবাজার সংস্কার ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বিত পরিবর্তন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে চীনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, তারা কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে