চিনের হোটেলে গোপন ক্যামেরার ফাঁদ, যুগলদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত বিক্রি হচ্ছে পর্নবাজারে
বিবিসির অনুসন্ধানে ফাঁস বহু বছরের স্পাই-ক্যাম নেটওয়ার্ক, শিকার থেকে গ্রাহক—দু’দিকেই তরুণরা
চিনের একাধিক হোটেলে গোপন ক্যামেরা বসিয়ে অতিথিদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত রেকর্ড করার অভিযোগ সামনে এনেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস। সেই সব ভিডিও পরে অনলাইন পর্নোগ্রাফি প্ল্যাটফর্মে বিক্রি ও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
হংকংয়ের বাসিন্দা এরিক (নাম পরিবর্তিত) এই চক্রের ভয়াবহতার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। তাঁর দাবি, ২০২৩ সালে একটি পর্ন সাইটে ঢুকে হঠাৎই নিজের এবং তাঁর বান্ধবীর ভিডিও দেখতে পান তিনি। দক্ষিণ চিনের শেনঝেন শহরের একটি হোটেলে তাঁদের থাকার সময় গোপনে রেকর্ড করা হয়েছিল সেই দৃশ্য।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরিক একমাত্র নন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চিনে সক্রিয় এই তথাকথিত ‘স্পাই ক্যাম পর্ন’ ব্যবসা। যদিও চিনে পর্নোগ্রাফি তৈরি ও বাণিজ্যিক ভাবে ছড়ানো আইনত নিষিদ্ধ, তবু বাস্তবে বহু হোটেলের ঘরে লুকিয়ে ক্যামেরা বসিয়ে অতিথিদের গোপন মুহূর্ত ধারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
কিছু ক্ষেত্রে শুধু ভিডিও রেকর্ডিং নয়, বরং অতিথিরা ঘরে প্রবেশ করার পর থেকেই ক্যামেরা চালু হয়ে যায় এবং সেই দৃশ্য লাইভ সম্প্রচার করা হয়। অর্থাৎ হোটেলের ঘরের ভেতরের প্রতিটি মুহূর্তই সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন অনলাইন দর্শকরা।
গত কয়েক বছরে বিষয়টি নিয়ে চিনের সমাজমাধ্যমে বারবার আলোচনা হয়েছে। গোপন ক্যামেরা শনাক্ত করার উপায় নিয়েও নানা পরামর্শ ছড়িয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে চিনা সরকার নতুন নির্দেশিকা জারি করে জানায়, হোটেল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত কক্ষ পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি বিবিসির।
সাত মাস ধরে চালানো নজরদারিতে বিবিসি জানতে পেরেছে, বিভিন্ন শহরের হোটেলে অন্তত ৫৪টি গোপন ক্যামেরা বসানো ছিল। এই সময়ের মধ্যেই প্রায় এক হাজার অতিথির ব্যক্তিগত মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হয়েছে বলে অনুমান।
তদন্তে উঠে এসেছে, টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমেই এই ভিডিওগুলির বড় অংশ ছড়ানো হয়। যদিও চিনে টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ, তবু নিষিদ্ধ পর্ন কনটেন্ট দেখা ও বিজ্ঞাপনের জন্য এই মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এক এজেন্টের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে বিবিসির প্রতিবেদক জানতে পারেন, একটি চ্যানেলের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার এবং সেখানে ২০১৭ সাল থেকে হাজার হাজার ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে।
বিবিসির দাবি, গত ১৮ মাসে এমন কয়েক ডজন এজেন্টের খোঁজ পাওয়া গেছে, যারা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। শুধুমাত্র এক এজেন্টই গত এক বছরে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা আয় করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিষয়টি জানানো হলে টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষ প্রথমে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। পরে বিস্তারিত তথ্য হাতে পাওয়ার পর তারা জানায়, গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কনটেন্টের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেয়। সংশ্লিষ্ট একটি অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যেই মুছে ফেলা হয়েছে।
এরিকের জীবনে এই ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি জানিয়েছেন, বান্ধবীকে বিষয়টি জানানোর পর দীর্ঘ সময় তাঁদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল না। আজও তিনি আশঙ্কায় ভোগেন—আবার কোথাও সেই ভিডিও ভেসে উঠবে কি না।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে