64°F মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

ভোটাধিকার প্রয়োগে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

বস্টন বাংলা অনলাইন ডেস্ক, Boston Bangla

প্রকাশ: ১০ ফেব ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ৪৬
ভোটাধিকার প্রয়োগে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

ভোটাধিকার প্রয়োগে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ভোটাধিকারহীনতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণকে নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।

ভোটের দুই দিন আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গুজব ও অপপ্রচারে কান না দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় নাগরিক কর্তব্য। তিনি স্পষ্ট করে জানান, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার তার দায়িত্ব শেষ করবে।

নির্বাচন ও গণভোটে নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

আগামী বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি একই দিনে গণভোটও আয়োজন করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, জুলাই সনদের আলোকে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের মতামত জানার জন্য এই গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

ভাষণের শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জনগণের আত্মত্যাগ না থাকলে এই নির্বাচন ও গণভোট সম্ভব হতো না। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের কাঠামো ও দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।

‘ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’

পরিবারসহ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের একটি ভোট শুধু সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি নতুন বাংলাদেশের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তাঁর ভাষায়, দেশের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি এখন ভোটারদের হাতেই।

এই ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ বার্তা

ভাষণে তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গত প্রায় দেড় দশকে ভোটাধিকার থাকলেও অনেক নাগরিক তা প্রয়োগ করতে পারেননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইতিহাস বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি এই নির্বাচনকে তরুণদের ‘প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভয়কে পেছনে রেখে সাহসের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় এসেছে। একটি ভোট ১৭ বছরের নীরবতার জবাব হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নারীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলেও এই নির্বাচন তাদের জন্য একটি নতুন সূচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

গণভোট হবে রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি

জুলাই সনদকে জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাঁর মতে, গণভোটে প্রদত্ত প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে, যার প্রভাব পড়বে বহু প্রজন্মজুড়ে।

তিনি বলেন, এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশ কোন পথে অগ্রসর হবে, শাসনব্যবস্থা কোন কাঠামোয় গড়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র কীভাবে গণতান্ত্রিক ও মানবিক রূপ লাভ করবে।

গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্কতা

নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না—এমন অপপ্রচারকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, এ ধরনের অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করা।

নাগরিকদের যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্যের জন্য ৩৩৩ হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

সহিংসতায় জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণতন্ত্রে বিজয়ের পাশাপাশি পরাজয়ও একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। ভোটকেন্দ্র দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তিনি আহ্বান জানান, যাতে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হন।

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’

প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও দুই হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রথমবারের মতো সারা দেশে সিসিটিভি, বডিক্যাম, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার ও পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

ভাষণের শেষাংশে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ভোটাধিকার কোনো দয়া নয়—এটি সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।