64°F রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থাকলেও ভোটে ভরাডুবি, দুবারেই জামানত হারালেন জেবেল রহমান গানি

Rokon Pathan, Boston Bangla

প্রকাশ: ১৫ ফেব ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ৪৪
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থাকলেও ভোটে ভরাডুবি, দুবারেই জামানত হারালেন জেবেল রহমান গানি

পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থাকলেও ভোটে ভরাডুবি, দুবারেই জামানত হারালেন জেবেল রহমান গানি

নীলফামারী-১ আসনে দাদা–বাবা–ফুফুর জয়, উত্তরসূরির পরপর দুই নির্বাচনে পরাজয়
দাদা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত সিনিয়র মন্ত্রী, বাবা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালী রাজনীতিক, ফুফুও ছিলেন সংসদ সদস্য। কিন্তু সেই রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেননি তাঁদের উত্তরসূরি জেবেল রহমান গানি। একাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুবারই পরাজিত হয়েছেন তিনি। এমনকি প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ না পাওয়ায় দুবারই তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

সর্বশেষ নির্বাচনের ফল

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-1 আসনে গাভি প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে জেবেল রহমান গানি পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৭৭ ভোট। একই আসনে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুস সাত্তার, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর প্রার্থী ছিলেন।

এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেবেল রহমান পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৯৯২ ভোট। সে সময় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আফতাব উদ্দিন সরকার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রার্থী হিসেবে।

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার

জেবেল রহমান গানির দাদা ছিলেন প্রয়াত মশিউর রহমান যাদু মিয়া। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ন্যাপ ভাসানীর প্রার্থী হিসেবে রংপুর-১ (বর্তমানে নীলফামারী-১) আসনে নির্বাচন করে ২৮ হাজার ৮৭০ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। পরে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে ৪৮ হাজার ৮৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হন। তাঁর হাতে রেলপথ, সড়ক পরিবহন, সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল।

১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে বড় ছেলে শফিকুল গানি স্বপন বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে রংপুর জেলা ভেঙে নীলফামারীসহ পাঁচটি জেলা গঠন করা হয়। ডোমার ও ডিমলা উপজেলা নিয়ে নীলফামারী-১ আসন গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করলে শফিকুল গানি বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টি-তে যোগ দেন। তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে শফিকুল গানি রংপুর-৩ ও নীলফামারী-১—দুই আসনেই বিজয়ী হন। পরে দলের সিদ্ধান্তে রংপুর-৩ আসন রেখে নীলফামারী-১ ছেড়ে দেন। ওই আসনের উপনির্বাচনে তাঁর বড় বোন মনসুরা মহিউদ্দিন জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে জয়ী হন।

শফিকুল গানি এরশাদ সরকারের সময়ে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

ন্যাপে নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন না পেয়ে শফিকুল গানি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০০৬ সালে ন্যাপ পুনর্গঠিত হলে তিনি দলটির চেয়ারম্যান হন। তাঁর সহধর্মিণী নাজহাত গানি ছিলেন দলের উপদেষ্টা।

২০০৯ সালের ২৩ আগস্ট শফিকুল গানির মৃত্যু হলে জেবেল রহমান গানি বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান হন। ২০১২ সালে তাঁর মা নাজহাত গানিও মারা যান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিলেও ২০১৮ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেন জেবেল রহমান। তবে দুইবারই উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে ব্যর্থ হন।

জনপ্রিয়তা হারানোর কারণ?

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দাদা–বাবা–ফুফুর সময়ে এলাকায় তাঁদের পরিবারের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রভাব কমেছে। জেবেল রহমান এলাকায় সেই সম্পর্ক ও সংগঠন ধরে রাখতে পারেননি বলেই অনেকে মনে করেন।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবির সরকার বলেন, নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট না পেলে কোনো প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নীলফামারী-১ আসনে জেবেল রহমান সেই ন্যূনতম ভোটও পাননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক ঐতিহ্য থাকলেই ভোটের মাঠে সাফল্য নিশ্চিত হয় না। সংগঠন, তৃণমূল যোগাযোগ ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক অবস্থান—এই তিনের সমন্বয় না হলে ঐতিহ্যও টিকিয়ে রাখা কঠিন। নীলফামারী-১ আসনে জেবেল রহমান গানির পরপর দুই নির্বাচনে ভরাডুবি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।