নিউইয়র্কে করোনা ত্রাণ তহবিল আত্মসাৎ: ৯ জনের দোষ স্বীকার, জরিমানা ১০ লাখ ডলারের বেশি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে করোনা মহামারির সময় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ তহবিল থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ৯ আসামি দোষ স্বীকার করেছেন। তাঁদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এবং একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আসামিরা ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কুইন্স সুপ্রিম কোর্ট-এ দোষ স্বীকার করেন। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে মোট ১০ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ ডলার ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছেন। ইতোমধ্যে ৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছেন আসামিরা।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান মেলিন্ডা ক্যাটজ এবং লুসি ল্যাং। তাঁরা জানান, দুর্যোগকালীন তহবিল আত্মসাৎ জনস্বার্থবিরোধী গুরুতর অপরাধ এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে আবেদন
সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ সালের জুন থেকে আসামিরা নিউইয়র্ক স্টেটের ‘এম্পায়ার স্টেট ডেভেলপমেন্ট প্যান্ডেমিক স্মল বিজনেস রিকভারি গ্র্যান্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় একাধিক ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে অনুদানের আবেদন করেন। করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার লক্ষ্যে গঠিত এ তহবিল থেকে অর্থ পেতে আবেদনকারীরা কর্মচারীদের বেতন, অফিস ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ও সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তবে New York State Inspector General’s Office-এর তদন্তে দেখা যায়, অর্থ পাওয়ার পরপরই বেশিরভাগ টাকা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ব্যাংক রেকর্ড ও কর-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, তহবিল পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছিল না।
তদন্ত ও আত্মসমর্পণ
ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিস ২০২৪ সালের মে মাসে তদন্ত শুরু করে এবং পরে মামলাটি Queens District Attorney’s Office-এ হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগ জানার পর আসামিরা ২০২৫ সালের ৬-৯ মে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন।
কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ বলেন, ‘মহামারির মতো নজিরবিহীন সংকটে হিমশিম খাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ তহবিল চুরি করা গুরুতর অপরাধ। দোষ স্বীকারের মাধ্যমে আসামিরা এখন ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।’
লুসি ল্যাং বলেন, দুর্যোগকালীন সহায়তা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা জনগণের আস্থার সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
আসামিদের পরিচয়
কর্তৃপক্ষ আসামিদের নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করেছে, তবে তাঁদের ছবি প্রকাশ করা হয়নি। আসামিরা হলেন মাহবুব মালিক (৪১), তোফায়েল আহমেদ (৫০), ইউসুফ এমডি (৪৫), মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ (৬৮), জাকির চৌধুরী (৫৯), মোহাম্মদ খান (৪৯), তানভীর মিলন (৫৫), জুনেদ খান (৫৬) এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নাদিম শেখ (৫৬)।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাকির চৌধুরীকে দেড় লাখ ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তিনি ইতিমধ্যে ৭৫ হাজার ডলার পরিশোধ করেছেন এবং আগামী ২৩ মার্চের মধ্যে বাকি অর্থ পরিশোধ করবেন বলে জানিয়েছেন।
জাকির চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি চাইলে বিচার পর্যন্ত লড়াই করতে পারতেন, তবে দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া ও সুনামের ঝুঁকি এড়াতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করছেন। তাঁর দাবি, সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার খোকন আশরাফ তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অনুদান নেন এবং অর্ধেক অর্থ নিয়ে যান।
অন্যদিকে মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনিই প্রথম ৭০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছেন এবং বিষয়টি এখন মীমাংসিত।
কঠোর বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারির সময় গঠিত ত্রাণ তহবিল আত্মসাতের বিরুদ্ধে নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। দুর্যোগকালীন সহায়তা তহবিলের অপব্যবহার যে কোনো পরিস্থিতিতেই আইনগতভাবে কঠোর শাস্তিযোগ্য—এ বার্তাই আবারও স্পষ্ট হয়েছে এই মামলার মাধ্যমে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে