নাইজেরিয়ায় মোটরসাইকেলে সশস্ত্র হামলা, তিন গ্রামে অন্তত ৩২ জন নিহত
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া-এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নাইজার স্টেট-এ শনিবার ভোরে মোটরসাইকেলে চড়ে আসা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তিনটি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ৩২ জনকে হত্যা করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা জানান, হামলাকারীরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে এবং বহু বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ভোরের এই হামলার লক্ষ্য ছিল টুঙ্গা-মাকেরি, কঙ্কোসো ও পিসা গ্রাম। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তি একযোগে গ্রামগুলোতে ঢুকে গুলি ছোড়ে এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেক বাসিন্দা প্রাণ বাঁচাতে পাশের এলাকায় পালিয়ে যান।
বেনিন সীমান্তসংলগ্ন বরগু এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে এমন হামলা বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ‘ডাকাত’ নামে ডাকা হলেও তারা অত্যন্ত সংগঠিত ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে থাকে। উত্তরাঞ্চলজুড়ে এসব গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ড, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এবং গ্রামবাসীকে বাস্তুচ্যুত করার জন্য দায়ী।
Niger State Police-এর মুখপাত্র ওয়াসিউ আবিওদুন জানান, শুধু টুঙ্গা-মাকেরি গ্রামেই ছয়জন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অসংখ্য মানুষকে অপহরণ করা হয়েছে, তবে এখনো সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি।’ কঙ্কোসো গ্রামে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তখনো পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, ‘যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চলছে এবং অপহৃতদের উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’
কঙ্কোসো গ্রামের বাসিন্দা জেরেমিয়া টিমোথি হামলার পর পাশের এলাকায় আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, শনিবার ভোর ৬টার দিকে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে। ‘পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়ার পর অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন,’ দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০০টির বেশি মোটরসাইকেলে করে হামলাকারীরা এলাকায় ঢুকে একের পর এক গ্রামে তাণ্ডব চালায়।
টুঙ্গা-মাকেরি গ্রামের বাসিন্দা আওয়াল ইব্রাহিম বলেন, স্থানীয় সময় রাত প্রায় তিনটার দিকে তাঁদের গ্রামে হামলা হয়। ‘অসংখ্য মোটরসাইকেলে চড়ে তারা ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়, ছয়জনের শিরশ্ছেদ করে এবং আরও কয়েকজনকে হত্যা করে। দোকানপাটে আগুন লাগিয়ে পুরো গ্রামকে পালাতে বাধ্য করে,’ বলেন তিনি।
কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, হামলার সময় আকাশে সামরিক যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যায়। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নাইজেরিয়াজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরাঞ্চলে একদিকে ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী, অন্যদিকে সশস্ত্র অপহরণকারী চক্র-এই দুইয়ের সমন্বয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিল নিরাপত্তা সংকট চলছে।
চলতি মাসের শুরুতে পাশের কাওরা স্টেট-এ ভয়াবহ এক হামলায় ১৬২ জন নিহত হন। শনিবারের হামলাকে সেই সহিংসতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত না করার অভিযোগ তোলে। যদিও বাস্তবে হামলার শিকার হচ্ছেন মুসলিম ও খ্রিষ্টান-উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই। এ অভিযোগের পর দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। গত ডিসেম্বরে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং দেশটিতে মার্কিন সামরিক দলের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক সহিংসতা ও অপহরণের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার, সীমান্ত এলাকায় টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শনিবারের রক্তক্ষয়ী হামলার পর এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালেও বাসিন্দাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের আবহ কাটেনি।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে