ইশতেহারের ভাষা: বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রপাঠ
রোকন পাঠান। বস্টন বাংলা
একটি জাতি যখন ভোটের সামনে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য লাইনে দাঁড়ায় না। সে দাঁড়ায় নিজের ইতিহাস, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার মুখোমুখি হয়ে। নির্বাচনী ইশতেহার সেই মুখোমুখি হওয়ার লিখিত দলিল-যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো শুধু প্রতিশ্রুতি দেয় না, বরং রাষ্ট্রকে তারা কীভাবে দেখে, ক্ষমতাকে কীভাবে ব্যবহার করতে চায় এবং নাগরিককে কোন অবস্থানে দাঁড় করাতে চায়-তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার পড়লে বোঝা যায়, উভয় দলই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভাঙা ও ক্লান্ত বলে মনে করছে। কিন্তু এই ভাঙনকে তারা ব্যাখ্যা করছে ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন দর্শনে। এই ভিন্নতা শুধু নীতিগত নয় এটি রাষ্ট্রচিন্তার ভিন্নতা।
বিএনপির ইশতেহারের ভাষা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক। সেখানে বারবার ফিরে আসে নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদীয় ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। এই ভাষা রাষ্ট্রকে দেখে একটি কাঠামো হিসেবে যার যন্ত্রাংশগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু মেরামত করলে আবার সচল করা সম্ভব। বিএনপির বিশ্বাস, গণতন্ত্রের সংকট কোনো দর্শনগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত বিপর্যয়। নিয়ম ফিরিয়ে আনলেই আস্থা ফিরবে এই হলো তাদের রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রীয় অনুমান।
এই কারণে বিএনপি নির্বাচনকে কেবল ভোটের দিন হিসেবে দেখে না; তারা দেখে পুরো ব্যবস্থাটিকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং সংসদের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব আসলে ভোটকে ঘিরে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরির প্রয়াস। তাদের চোখে রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক যন্ত্র যেখানে ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে।
জামায়াতের ইশতেহার পড়লে ভাষার সুর বদলে যায়। এখানে রাষ্ট্র কোনো যন্ত্র নয়; এটি একটি নৈতিক সত্তা। জামায়াত বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে দেখে নৈতিক পতনের ফল হিসেবে। তারা বারবার উচ্চারণ করে “ন্যায়”, “মানবিক রাষ্ট্র”, “স্বচ্ছতা” এবং “জবাবদিহি”। এই ভাষা বলে দেয়, জামায়াতের কাছে সমস্যার মূল কাঠামো নয় সমস্যা মানসিকতা ও শাসনের দর্শনে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জামায়াত প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তোলে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আলোচনা, রাজনৈতিক সংস্কারের কথা, নারীর অংশগ্রহণ এসব প্রস্তাব আসলে ক্ষমতার চরিত্র বদলের ইঙ্গিত। জামায়াত রাষ্ট্রকে নতুন করে কল্পনা করতে চায়, যেখানে শাসন শুধু বৈধ নয় নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য হবে।
শাসন ও দুর্নীতির প্রশ্নে এই দুই দলের পার্থক্য আরও স্পষ্ট। বিএনপি দুর্নীতিকে দেখে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে। তাই তারা কমিশন, তদন্ত সংস্থা, বিচারব্যবস্থা, অডিট এবং আইনগত সংস্কারের কথা বলে। তাদের বিশ্বাস, কাঠামো ঠিক হলে মানুষ নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।
অন্যদিকে জামায়াত দুর্নীতিকে দেখে নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে। তাদের ভাষায় আইন আছে, কিন্তু ন্যায় নেই; প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই। তাই তারা শাসনের নৈতিক পুনর্গঠনের কথা বলে। এই পুনর্গঠনে জনগণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক শাসন।
অর্থনীতির প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের পার্থক্য শুধু নীতিতে নয়, সময়বোধেও। বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড। এখানে রাষ্ট্র একটি বড় পরিকল্পনাকারী ও বিতরণকারী শক্তি।
জামায়াত অর্থনীতিকে দেখে দৈনন্দিন কষ্টের দৃষ্টিকোণ থেকে। দ্রব্যমূল্য, কর, সুদ, কর্মসংস্থান তাদের ভাষা সরাসরি মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। তারা অর্থনীতিকে ন্যায় ও স্বস্তির প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করে।
এই দুই ইশতেহার পড়লে শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে রাষ্ট্র আসলে কী? বিএনপির কাছে রাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক কাঠামো, যা নিয়মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। জামায়াতের কাছে রাষ্ট্র একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি, যা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
এই নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির নির্বাচন রাষ্ট্রকে আমরা যন্ত্র হিসেবে দেখতে চাই, না নৈতিক চুক্তি হিসেবে। ভোটার এখানে কেবল দল বাছেন না; তিনি বেছে নেন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভাষা।
এই প্রবন্ধটি বিএনপি ও জামায়াতের সাম্প্রতিক ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আলোকে প্রস্তুত। এটি কোনো দলীয় প্রচারণা নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি চিন্তাশীল, সাহিত্যিক পাঠ। Boston Bangla বিশ্বাস করে গণতন্ত্র বোঝার জন্য প্রয়োজন গভীর পাঠ, শুধু শিরোনাম নয়।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে