ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, এর অর্থনৈতিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ এখনো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করায় পরিবহন, কৃষি ও খুচরা ব্যবসাসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়ছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আত্মবিশ্বাসী অবস্থান বজায় রেখেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে তিনি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, এতে ভেনেজুয়েলার তেল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার সম্ভব হয়েছে এবং কিউবার ওপরও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ তাদের জ্বালানির উৎস সীমিত হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানও শেষ পর্যন্ত একই ধরনের কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে। যদিও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, তবুও ট্রাম্পের অবস্থান বদলায়নি। তিনি বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই জয়ী হবে—যদিও সেই ‘জয়’ কেমন হবে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেলে স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য “খুবই সামান্য মূল্য”।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাস্তবতা
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে অনেক উন্নত অর্থনীতির চেয়ে বেশি সুরক্ষিত অবস্থায় আছে। গত দুই দশকে দেশীয় তেল উৎপাদন বাড়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩৮ শতাংশ তেল থেকে আসে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় এই হার ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবুও বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয়নি। ইরান হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করায় ইউরোপীয় বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। একই সময়ে কাতারের তরলীকৃত গ্যাস স্থাপনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ইতিমধ্যে প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৫০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, খুচরা পেট্রলের দাম ২০২৫ সালের স্তরে ফিরতে ২০২৭ সালের শরৎ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ডিজেলের দামও অন্তত আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় নামার সম্ভাবনা কম।
জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ও কৃষি খাতে সরাসরি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। পরিবহন কোম্পানিগুলো বাড়তি খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপালে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি করছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্চ থেকেই মূল্যস্ফীতির হার বাড়তে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক। অতীতে দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষেত্রে মার্কিন জনমতের বিরোধিতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের উচ্চ ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মিলিয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা ও বিমা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার কিছু তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল এবং ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর উপায়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্দার শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে যখন তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান হয়ে থাকে, তখন প্রায়ই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা গেছে। যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৪০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেও মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় বা সেখানে সামরিক বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।
অনিশ্চিত যুদ্ধ
ট্রাম্প একদিকে তেহরানের “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করছেন, অন্যদিকে বলছেন যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে দ্রুত কোনো স্থায়ী বিজয় অর্জন করা কঠিন।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডের হাজার হাজার যোদ্ধা এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং তারা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ফলে এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে