72°F বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

গণহত্যা দিবসে জাতির শোক, স্মরণ অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতা ও স্বাধীনতার সূচনা

বস্টন বাংলা অনলাইন ডেস্ক, Boston Bangla

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ৩০
গণহত্যা দিবসে জাতির শোক, স্মরণ অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতা ও স্বাধীনতার সূচনা

বাঙালি জাতির ইতিহাসে আজ এক গভীর শোকের দিন। ১৯৭১ সালের এই রাতে নেমে এসেছিল এক বিভীষিকাময় অন্ধকার, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর চালায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। সেই কালরাত্রির স্মরণে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় গণহত্যা দিবস।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে হামলা চালায়। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নির্মূল করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানার ইপিআর সদর দপ্তর এবং পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে চলে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। ট্যাংক, মর্টার ও ভারী অস্ত্রের গুলিতে রাতভর কেঁপে ওঠে পুরো শহর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বিশেষ করে জগন্নাথ হল, হয়ে ওঠে হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু। বহু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ওই রাতেই ঢাকায় হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অনেক স্থানে গণকবর খুঁড়ে মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়, যার ওপর বুলডোজার চালিয়ে প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

শুধু রাজধানী নয়, একই রাতে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা, যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে চিরতরে দমন করা।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল গোপনে এবং এর কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত নথি রাখা হয়নি। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে নির্দেশনা দিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে কিছু স্মৃতিকথা ও গবেষণায় উঠে আসে, একটি সাধারণ কাঠপেনসিলে লেখা খসড়ার মাধ্যমে এই পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল—যা দ্রুত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যেই এমনভাবে তৈরি করা হয়।

বিদেশি সাংবাদিক ও গবেষকদের বিবরণেও উঠে এসেছে সেই রাতের ভয়াবহতা। অনেকের মতে, ২৫ মার্চের রাতেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ আরও বিস্তৃত হয়। গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মাধ্যমে এক মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা ঘটে, যা বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত।

এই নৃশংসতার মধ্যেই বাঙালি জাতি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা আসে এবং শুরু হয় নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ সংগ্রাম ও অসংখ্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়, প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

গণহত্যা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তারা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার ইতিহাস ও ত্যাগের চেতনা ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এ বছর প্রতীকী ‘ব্ল্যাকআউট’ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জা না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি জোরদার হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ওই সময়কার হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ২৫ মার্চ শুধু শোকের দিন নয়—এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সূচনার প্রতীক। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ইতিহাসের নির্মম অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে মানবতা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে আরও শক্তভাবে ধারণ করা জরুরি।

একাত্তরের সেই কালরাত্রির অন্ধকার পেরিয়েই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ভোর—স্বাধীন বাংলাদেশের। তাই ২৫ মার্চের শোক, একই সঙ্গে ২৬ মার্চের প্রভাতের প্রত্যয়েরই আরেক নাম।