‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়তে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত রেজা পাহলভি
মিউনিখে সমাবেশে বক্তব্য, ট্রাম্পের ‘সরকার পরিবর্তন’ মন্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহর ছেলে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি বলেছেন, তিনি ইরানে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘সরকার পরিবর্তনই সবচেয়ে ভালো উপায়’ হতে পারে-এমন মন্তব্য করার পর শনিবার জার্মানির মিউনিখ-এ আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে এ ঘোষণা দেন তিনি।
সমাবেশে প্রায় দুই লাখ সমর্থক উপস্থিত ছিলেন বলে আয়োজকদের দাবি। তাঁদের সামনে দেওয়া ভাষণে রেজা পাহলভি বলেন, ‘একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে রূপান্তরের নিশ্চয়তা দিতেই আমি এখানে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের জন্য রূপান্তরের নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ-যেন একদিন আমরা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারি।’
স্লোগানে মুখর সমাবেশ
সমাবেশস্থলে উপস্থিত জনতা ‘জাভিদ শাহ’ (শাহ দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগান দেন। তাঁরা সবুজ, সাদা ও লাল রঙের পতাকা ওড়াচ্ছিলেন, যার মাঝখানে সিংহ ও সূর্যের প্রতীক-ইরানের ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী চিহ্ন।
৬২ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক সাইদ এএফপিকে বলেন, ‘ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা একটি মৃত শাসনব্যবস্থা। এর অবসান হওয়া উচিত।’
রেজা পাহলভি দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ইরানিদের প্রতিবাদ জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি শনি ও রোববার ইরানি সময় রাত আটটায় নিজ নিজ বাড়ির ছাদ ও বারান্দা থেকে একযোগে স্লোগান দেওয়ার ডাক দেন, যাতে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
রেজা পাহলভির এ বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ হতে পারে। তেহরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
গত মাসে ইরানে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করলে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছে।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রেজা পাহলভি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছি-ইরানের মানুষ আপনাকে বলতে শুনেছে যে সাহায্য আসছে। আপনার ওপর তাদের আস্থা আছে। তাদের সাহায্য করুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটার সময় এসেছে।’
কূটনৈতিক তৎপরতা ও জেনেভা বৈঠক
উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ওমানে দুই দেশের প্রতিনিধিরা তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান সরকার আগামী সপ্তাহে জেনেভা-এ নতুন দফা বৈঠকের আয়োজন করবে। তবে বৈঠকের এজেন্ডা বা সম্ভাব্য অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সামরিক চাপ ও ‘সরকার পরিবর্তন’-এর মতো বক্তব্য, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার ধারাবাহিকতা-এই দ্বৈত কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের মূল মনোযোগ তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরেই বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
দীর্ঘ বৈরিতার ইতিহাস
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সেই বিপ্লবের সময়ই দেশ ছাড়েন রেজা পাহলভি। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং নিজেকে ইরানে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক চাপ ও পারমাণবিক ইস্যু-সব মিলিয়ে দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রেজা পাহলভির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে