২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে—এমন আভাস দিয়েছে সরকার। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যখন মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিদেশে বসবাসরত প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ বাংলাদেশির ভোটাধিকার বাস্তবায়নের বিষয়টি। দীর্ঘদিন ধরে আইনি কাঠামো থাকলেও প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রবাসীরা মনে করছেন, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক আশ্বাসকে ঘিরে এবার বাস্তব অগ্রগতির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই প্রবাসীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ বরাবরই সীমিত ছিল। তাদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচন হতে পারে প্রবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, যেখানে দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা সম্ভব।
এলএসসিআই-এর চেয়ারম্যান ও সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ ইউকে-এর আহ্বায়ক নাসরুল্লাহ খান জুনায়েদ বলেন, সংবিধানে ভোটাধিকার নিশ্চিত থাকলেও প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি এতদিন এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তিনি জানান, প্রবাসীরা মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার ভোটারের সমান প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানসহ ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে, এমনকি কোথাও কোথাও সংসদে আলাদা আসনও রয়েছে। বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান তিনি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করা হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের জন্য আইটি–সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগে পোস্টাল ব্যালট পেতে ভোটারকে সরাসরি আবেদন করতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ। নতুন ব্যবস্থায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ এবং ব্যালট দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পোস্টাল ব্যালটে একটি নির্দিষ্ট হারে ভোট নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের মতো বৃহৎ ডায়াস্পোরার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। এ কারণে বিকল্প পদ্ধতি ও কারিগরি দিকগুলো যাচাই করতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন আলাদা একটি প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোট গ্রহণে আনুমানিক ৭০০ টাকা ব্যয় হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, প্রক্সি ভোটের ধারণা থেকে সরে এসে ধাপে ধাপে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে কমিশন। ভবিষ্যতে পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন ভোটিংয়ের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়ন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের একটি বড় পরীক্ষা। ২০২৬ সালের নির্বাচনই নির্ধারণ করবে—দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কতটা আন্তরিক ও প্রস্তুত।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে